আন্তর্জাতিক

ইউনূস-মোদি বাতচিতে পাল্লা ভারি কার ?

অবশেষে ড. ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করলেন নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং প্রায় চৌদিক বেষ্টন করে থাকা ভারতের সঙ্গে আমাদের সমস্যা, দেনাপাওনা ও লেনদেন সবচে’ বেশি। বাংলাদেশ সব সমস্যার সমাধান গায়ের জোরে নয়, আলোচনায় চায়। ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা রেজিমের সঙ্গে গভীর বন্ধনে আবদ্ধ ছিল ভারত। সে সম্পর্ক অধীনতামূলক মিত্রতা বলে সমালোচিত ছিল। ছাত্রগণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা এখনো ভারতেই আশ্রিত এবং এই পটপরিবর্তনকে মন থেকে মানতে পারেনি ভারতের মোদি সরকার।

বাংলাদেশ তার নোবেল লরিয়েট সরকার প্রধানের সঙ্গে মোদিকে একটা বৈঠকে বসাতে গোড়া থেকেই জোর দেনদরবার ও কূটনীতি চালিয়ে এসেছে। আট মাসের মাথায় সে চেষ্টা ফলবতী হলো। মুখ না দেখতে গোঁ ধরা সিদ্ধান্ত পালটে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অবশেষে ব্যাংককে বিমসটেক সামিটের সাইডলাইনে প্রায় পৌনে এক ঘন্টার বৈঠক করলেন তার বাংলাদেশি কাউন্টারপার্ট এর সঙ্গে। এই শীর্ষ সম্মেলনেই বাংলাদেশের ইউনূস বিমসটেক এর চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

শুরু থেকেই বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি কোষ্ঠকাঠিন্য চেহারা নিয়ে থাকা ভারত-পক্ষকে বৈঠকে বেশ সৌজন্যময় মনে হয়েছে। মিটিংয়ের ভেন্যুতে ড. ইউনূস গিয়ে পৌঁছালে সেখানে আগে থেকেই মোতায়েন থাকা পুরো ভারতীয় টিম দাঁড়িয়ে সসম্মানে তাঁকে বরণ করে নেন।

এই বৈঠকের ফলাফল সম্পর্কে চটজলদি কোনো মতামত না দিয়ে আমি শুধু প্রাপ্ত বিবরণটুকুই পেশ করতে চাই এ লেখায়। ড. ইউনূস বিমসটেকের চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী মোদি তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং সদ্য বিগত ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন।

ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও মর্যাদার কথা উল্লেখ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, নয়াদিল্লি সব সময় প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানিয়ে যাবে। নয়াদিল্লি সব সময় ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সময় থেকেই দু’দেশের ইতিহাস জটিল গ্রন্থিতে আবদ্ধ।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের বিশেষ কোনো দলকে ভারত সমর্থন করে না। আমাদের সম্পর্ক হচ্ছে জনগণের সঙ্গে জনগণের।

দুই নেতার মধ্যকার প্রথম এ বৈঠকে ড. ইউনূসও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশ অতি মূল্যবান মনে করে বলে উল্লেখ করেন। অভিন্ন ইতিহাসের শরিকানা, ভৌগলিক নৈকট্য ও সাংস্কৃতিক কুটুম্বিতার মাধ্যমে স্থাপিত হয়েছে দু’দেশের গভীর বন্ধুত্ব। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তার জন্যও তিনি ধন্যবাদ জানান। তিনি দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যাবলীর কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, উভয় দেশের জনগণের কল্যাণে এ সম্পর্ককে সঠিক খাতে ফিরিয়ে আনতে আমরা একত্রে কাজ করতে চাই।

বিমসটেকের সাত সদস্য দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে ভারতের সমর্থন কামনা করেন ড. ইউনূস। তিনি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন ও তিস্তার পানি ভাগাভাগির চুক্তি সম্পাদনেরও আহ্বান জানান।

শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশের অনুরোধের ব্যাপারে কদ্দুর কী হলো তাও ড. ইউনূস জানতে চান নরেন্দ্র মোদির কাছে। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বিভিন্ন মিডিয়া আউটলেটে উত্তেজনাকর কথা বলছেন এবং বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন। এসব কার্যকলাপের মাধ্যমে তিনি ভারত তাকে যে আশ্রয় দিয়েছে সেই সুযোগের অপব্যবহার করছেন। হাসিনা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উসকানিমূলক অভিযোগ একটানা করেই চলেছেন।

ড. ইউনূস বলেন, ভারতে বসে বাংলাদেশে হাঙ্গামা সৃষ্টিকারী প্রচারণা চালানো থেকে হাসিনাকে বিরত করার ব্যাপারে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে আমরা ভারত সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি।

বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থান দমনে বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের লোকদের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্টের কথা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, তাদের হিসেবেই ১৪শ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার ১৩ শতাংশ শিশু। সে সময় খুন, নির্যাতনসহ মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর সব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। জাতিসংঘ রিপোর্টেই বলা হয়েছে, তখনকার প্রধানমন্ত্রী নিজে নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন আন্দোলনকারী নেতাদের আটক করে তাদেরকে খুনের পর লাশ গুম করে ফেলতে।

হাসিনার মন্তব্যের ভিত্তিতে উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সোশ্যাল মিডিয়াকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, আমাদের সম্পর্ক দেশের সঙ্গে, কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে নয়।

ড. ইউনূস সীমান্তে হত্যার প্রসঙ্গ তুলে সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে এ হত্যা বন্ধে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানান। মোদি বলেন, ভারতের সীমান্তরক্ষীরা আত্মরক্ষায় বাধ্য হয়ে গুলি চালায় এবং হতাহতের ঘটনাগুলো ভারতীয় সীমানার ভেতরেই ঘটে থাকে। তবে তিনি সীমান্তে হত্যার ঘটনা হ্রাসে একত্রে কাজ করতে সম্মতি জানান।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী মোদির উদ্বেগের ব্যাপারে ড. ইউনূস বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ব্যাপারে প্রচারিত সংবাদ অনেকটাই অতিরঞ্জিত। এ ছাড়া একেবারে ভুয়া সংবাদও ছড়ানো হচ্ছে। তিনি সাংবাদিক পাঠিয়ে সরেজমিনে প্রতিটি ঘটনা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান ভারতীয় নেতাদের প্রতি। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও নারী নিবর্তনের প্রতিটি অভিযোগ তদারকের জন্য তার সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো সহিংসতা রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

পারস্পরিক সাফল্য ও কল্যাণ কামনা করে সমাপ্ত বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন, প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান, ভারতের বিদেশমন্ত্রী জয়শংকর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।

বৈঠক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি জানান, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আর কিছু বলা সম্ভব নয়।

আমার মন বলছে বৈঠকের যেটুকু বিবরণ ও বয়ান আমি দিলাম তা পড়েই বিজ্ঞ পাঠকেরা বুঝতে পারবেন বরফ কতোটা গললো, লাভক্ষতির পাল্লা কোন্ দিকে ভারি হলো এবং অনমনীয়তার ওপর কূটনীতি কতটুকু বিজয় অর্জন করলো।

মারুফ কামাল খান: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক

ই-মেইল: [email protected]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *