অর্থনীতি

কঠিন সময়ে চ্যালেঞ্জের বাজেট

অর্থনীতির কঠিন সময়ে দৃঢ় উদ্যোগের বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। উত্থাপিত বাজেটের লক্ষ্য বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উত্তাল বৈতরণী সামাল দেওয়া।

মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে আনা ও ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা সামাল দেওয়ার মতো কঠোর পরিস্থিতি মোকাবিলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এ বাজেটে।

বৃহস্পতিবার (৬ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে নতুন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এটি মাহমুদ আলীর প্রথম বাজেট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা চতুর্থ মেয়াদের প্রথম বাজেট।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে সাত লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। বাকি দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা আসবে ঋণ থেকে।

প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ধরা রাখার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছ। মোট জিডিপির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

২০২৬ সালে এলডিসি-উত্তরণ, ২০৩১ সালে উচ্চ মধ্যম আয়ের মর্যাদা এবং ২০৪১ সালে একটি উন্নত দেশে রূপান্তরিত হওয়ার মতো লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে আগামী পাঁচ বছরের অর্থনৈতিক পথনকশা হিসেবে প্রণীত এ বাজেট বাস্তবায়ন বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে অর্থমন্ত্রীর জন্য।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে করছাড় সুবিধা দিতে হচ্ছে। নিম্ন আয়ের মানুষকে স্বস্তি দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আবার রাজস্ব আদায়ের বড় প্রাক্কলন বাস্তবায়ন করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন, খোদ অর্থমন্ত্রীই উল্লেখ করেছেন তার বক্তৃতায়।

জিডিপি
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে যা ছিল ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। পরে তা কমিয়ে সাড়ে ৬ শতাংশ করা হয়।

রাজস্ব
প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব প্রাপ্তি ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি বছরের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি। রাজস্ব আহরণে বরাবরের মতো এবারও বেশিরভাগ আয় করার দায়িত্ব থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। আগামী অর্থবছরে এনবিআরকে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের চেয়ে যা ৫০ হাজার কোটি টাকা বেশি। নন-এনবিআর খাত থেকে রাজস্ব আসবে আরও ১৫ হাজার কোটি টাকা। আর কর ব্যতীত প্রাপ্তির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায়ে বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে যা আদায় হয়েছে, তাতে এনবিআর লক্ষ্য পূরণ থেকে অনেকটাই দূরে আছে। এর সঙ্গে প্রস্তাবিত বাজেটে আরও ৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়নো হয়েছে। ফলে আগামী বাজেটের লক্ষ্য পূরণ রাজস্ব বোর্ডের জন্য অনেকটাই কঠিন হবে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)
প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে দুই লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরে যা ছিল দুই লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে ১৮ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে এডিপির আকার করা হয়েছে দুই লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) তুলনায় নতুন বাজেটে এডিপির আকার ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে এক লাখ ৬৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ থেকে এক লাখ কোটি টাকার সংস্থান ধরা হয়েছে।

বাজেট ঘাটতি
বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। যা জিডিপির ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে এক লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি। এর মধ্যে প্রধান উৎস হচ্ছে ব্যাংক খাত। এই খাত থেকে মোট এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। আর ৯৫ হাজার ১০০ টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে পাওয়ার আশা করছে সরকার। বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি ছিল দুই লাখ ৮৩ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করা, বৈদেশিক মুদ্রার হার ও রিজার্ভ স্থিতিশীল করা, আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং জ্বালানি ও সারের ভর্তুকি বকেয়া পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর সামনে অন্যান্য চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে, বিগত তিন বছরের কৃচ্ছ্রসাধন নীতি থেকে ধীরে ধীরে বের হওয়া, সময়মতো সমাপ্তির উদ্দেশ্যে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলোয় অর্থায়নের জন্য কম-প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো বাদ দেওয়া, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিদেশি অনুদানপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো ত্বরান্বিত করা এবং কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশের উন্নতি ঘটানো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *